সুরা আল-বাকারা: ১-৪০ আয়াতের সহজ ব্যাখ্যা

সুরা আল-বাকারা (১-৪০ আয়াত) এর তাফসির সহজ বাংলায়। কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ অংশের অর্থ ও শিক্ষা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আপনার আত্মিক উন্নতির জন্য পড়ুন আমাদের এই বাংলা ব্যাখ্যা।

SURA

3/12/20251 min read

সূরা আল-বাকারার ১ থেকে ২০ নং আয়াতের মূল বিষয়বস্তু নিম্নে বাংলায় সহজভাবে বর্ণনা করা হলো:

আয়াত ১-৫: মুত্তাকীদের পরিচয় ও কুরআনের উদ্দেশ্য

- আয়াত ১: "আলিফ-লাম-মিম" — এটি বিচ্ছিন্ন অক্ষর (হুরূফে মুকাত্তাআত), যা কুরআনের রহস্যময় বৈশিষ্ট্য।

- আয়াত ২-৩: কুরআন এমন একটি কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটি মুত্তাকী (আল্লাহভীরু) লোকদের জন্য হিদায়াত। মুত্তাকীরা অদৃশ্য জগতে বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে, এবং আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে দান করে।

- আয়াত ৪-৫: তারা আল্লাহর নাজিলকৃত কিতাব (কুরআন) ও পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে (তাওরাত, ইনজিল) বিশ্বাস করে। এরাই সত্য পথপ্রাপ্ত এবং এরাই সফলকাম।

আয়াত ৬-৭: কাফিরদের অবস্থা

- আয়াত ৬-৭: যারা ঈমান আনবে না, তাদের জন্য সতর্কবাণী বা না-সতর্কবাণী একই। আল্লাহ তাদের অন্তরে ও কানে মোহর মেরে দিয়েছেন, চোখে ঢেকে দিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।

আয়াত ৮-২০: মুনাফিকদের ভণ্ডামি ও পরিণতি

- আয়াত ৮-৯: কিছু লোক মুখে বলে, "আমরা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করি," কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা মিথ্যাবাদী। তারা ঈমানদারদের ধোঁকা দিতে চায়, কিন্তু নিজেরাই অজান্তে ধোঁকায় পড়ে।

- আয়াত ১০-১২: তাদের অন্তরে রোগ (কুফর ও সন্দেহ) আছে। আল্লাহ তাদের রোগ বাড়িয়ে দেন। তারা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে, অথচ নিজেদেরকে সংস্কারক মনে করে।

- আয়াত ১৩-১৫: যখন তাদের বলা হয়, "ঈমান আনো যেমন অন্যরা ঈমান এনেছে," তারা ঠাট্টা করে বলে, "আমরা কি অজ্ঞদের মতো ঈমান আনব?" আসলে তারাই অজ্ঞ। আল্লাহ তাদের ঠাট্টার জবাব দেন এবং তাদেরকে অন্ধকারে ছেড়ে দেন।

- আয়াত ১৬-২০: মুনাফিকরা সত্যের আলোকে বেচে নিয়ে অন্ধকার ক্রয় করে (সত্য প্রত্যাখ্যান করে)। তাদের অবস্থা বজ্রপাতের মতো ভয়াবহ: আলো দেখে সামনে এগোয়, কিন্তু অন্ধকারে আটকে যায়। তারা মৃত্যুভয়ে কান ঢেকে নেয়, কিন্তু আল্লাহ সবকিছু ঘিরে আছেন।

প্রধান শিক্ষা:

১. মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য: অদৃশ্যে বিশ্বাস, নামাজ-দান, পূর্ববর্তী কিতাবে বিশ্বাস।

২. কাফিরদের চিত্র: জেদ ও অহংকারে সত্য প্রত্যাখ্যান।

৩. মুনাফিকদের স্বরূপ: ভণ্ডামি, সমাজে ফিতনা সৃষ্টি, এবং আখিরাতের শাস্তির অজ্ঞতা।

এই আয়াতগুলোতে ঈমান, কুফর ও নিফাকের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে, যা সূরা আল-বাকারার মূল বিষয়বস্তুর ভিত্তি তৈরি করে।

সূরা আল-বাকারার ২০ থেকে ৪০ নং আয়াতের মূল বিষয়বস্তু নিম্নে ধাপে ধাপে বাংলায় বর্ণনা করা হলো:

---

আয়াত ২০-২৯: সৃষ্টি, সতর্কতা ও পারলৌকিক জীবনের বর্ণনা

- আয়াত ২০-২০: মুনাফিকদের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে—তাদের অবস্থা বজ্রপাতের মতো; আলো দেখে সামনে এগোলে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। আল্লাহ চাইলে তাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিতে পারেন।

- আয়াত ২১-২২:সকল মানুষের প্রতি আহ্বান: "হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত করো, যিনি তোমাদের ও পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন। তিনি আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যা দিয়ে তোমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করেন।"

- আয়াত ২৩-২৪: কুরআনের চ্যালেঞ্জ: কাফিরদেরকে বলা হয়েছে, "যদি কুরআন আল্লাহর বাণী না হয়, তাহলে এর মতো একটি সূরা তৈরি করে দেখাও!" এটা অসম্ভব, কারণ কুরআন আল্লাহর মুজিজা। অবিশ্বাসীদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে জাহান্নামের আগুন।

- আয়াত ২৫:জান্নাতের বর্ণনা: যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে, তাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি। সেখানে প্রবাহিত নদী, উত্তম ফল-মূল এবং পবিত্র সঙ্গীরা থাকবে।

আয়াত ২৬-২৯: আল্লাহর নিদর্শন ও মানুষের অহংকার

- আয়াত ২৬: আল্লাহ একটি মশার উদাহরণ দেন যাতে জ্ঞানীরা হিদায়াত পায়, আর অহংকারীরা পথভ্রষ্ট হয়। মুনাফিকরা বলে, "এ উদাহরণে আল্লাহর কী উদ্দেশ্য?" আল্লাহ তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেন।

- আয়াত ২৭: যারা আল্লাহর অঙ্গীকার (চুক্তি) ভঙ্গ করে, সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে—তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।

- আয়াত ২৮-২৯: সৃষ্টির উদ্দেশ্য: "তোমরা মৃত ছিলে, আল্লাহ তোমাদের জীবিত করলেন, আবার মৃত্যু দেবেন ও পুনরায় জীবিত করবেন।" তিনি সবকিছুর স্রষ্টা; আসমান ও জমিনের সকল সম্পদ মানুষের জন্য।

আয়াত ৩০-৩৯: আদম (আ.) ও ইবলিসের কাহিনী

- আয়াত ৩০: আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন, "আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা (প্রতিনিধি) নিযুক্ত করতে চাই।" ফেরেশতারা জিজ্ঞাসা করেন, "যারা রক্তপাত ও ফাসাদ সৃষ্টি করবে, তাদেরকেই কি প্রতিনিধি বানাবেন?" আল্লাহ বলেন, "আমি জানি, যা তোমরা জানো না।"

- আয়াত ৩১-৩৩: আল্লাহ আদমকে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দেন এবং ফেরেশতাদের তা বলতে বলেন। তারা অক্ষম হলে আদম (আ.) নামগুলো বললেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।

- আয়াত ৩৪: ইবলিস (শয়তান) আদমকে সিজদা করতে অস্বীকার করে। সে অহংকার করে বলে, "আমি আগুন থেকে তৈরি, আর আদম কাদা থেকে। আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।"

- আয়াত ৩৫-৩৬: আদম ও হাওয়াকে জান্নাতে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়, কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় তারা নিষিদ্ধ গাছের ফল খায়। এরপর তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়।

- আয়াত ৩৭-৩৯: আদম (আ.) আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, এবং আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। আল্লাহ বলেন, "যারা আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় বা দুঃখ নেই। আর যারা কুফরি করবে, তারা জাহান্নামের বাসিন্দা।"

আয়াত ৪০-৪০: বনি ইসরাইলের প্রতি উপদেশ

- আয়াত ৪০: "হে বনি ইসরাইল! আমার সেই নিয়ামত স্মরণ করো, যা আমি তোমাদের উপর দান করেছি। আর আমার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করো, আমিও তোমাদের অঙ্গীকার পূরণ করব। শুধু আমাকেই ভয় করো।

প্রধান শিক্ষা:

১. আদম (আ.)-এর ঘটনা: মানুষের পরীক্ষা, শয়তানের ধোঁকা ও তাওবার গুরুত্ব।

২. ইবাদতের আহ্বান: আল্লাহর সৃষ্টি নিদর্শন চিন্তা করে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া।

৩. কাফির-মুনাফিকদের পরিণতি: অহংকার ও পথভ্রষ্টতার শাস্তি।

৪. বনি ইসরাইলের দায়িত্ব: আল্লাহর নিয়ামতের স্মরণ ও অঙ্গীকার রক্ষা।

এই আয়াতগুলোতে মানবজাতির সৃষ্টির উদ্দেশ্য, শয়তানের চ্যালেঞ্জ, ও পূর্ববর্তী উম্মতের শিক্ষা ফুটে উঠেছে। পরবর্তী আয়াতগুলোতে বনি ইসরাইলের ইতিহাস বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে।